নতুন ধরন ডায়বেটিসের টাইপ-৫


টাইপ-৫ ডায়াবেটিস ও অপুষ্টিজনিত ডায়াবেটিস সম্পর্কে তথ্য


টাইপ-৫ ডায়াবেটিস কী? নতুন ধরনের ডায়াবেটিস সম্পর্কে যা জানা জরুরি


ডায়াবেটিস বলতেই আমরা সাধারণত টাইপ-১ ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের কথা ভাবি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে টাইপ-৫ ডায়াবেটিস (Type 5 Diabetes) নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এটি মূলত দীর্ঘদিনের অপুষ্টি বা অপুষ্টিজনিত সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বিশেষ ধরনের ডায়াবেটিস, যা আগে Malnutrition-Related Diabetes Mellitus (MRDM) নামে পরিচিত ছিল।


২০২৫ সালে International Diabetes Federation (IDF) টাইপ-৫ ডায়াবেটিসকে আলাদা একটি শ্রেণি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে। এই অবস্থাটি বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে, দক্ষিণ এশিয়া ও সাব-সাহারান আফ্রিকার কিছু জনগোষ্ঠীর মধ্যে দেখা যেতে পারে।


টাইপ-৫ ডায়াবেটিস কেন হয়?


টাইপ-৫ ডায়াবেটিসের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অপুষ্টির সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে কৈশোর ও তরুণ বয়সের আগে বা সেই সময়ে দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টি শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও অগ্ন্যাশয়ের (Pancreas) বিকাশকে প্রভাবিত করতে পারে।


এর ফলে শরীরে পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি বা নিঃসরণে সমস্যা হতে পারে এবং রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে।


তবে টাইপ-৫ ডায়াবেটিসের কারণ ও জৈবিক প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণা এখনও চলছে। তাই শুধু রোগী খুব রোগা বা অপুষ্টিতে ভুগছেন বলেই তাকে টাইপ-৫ ডায়াবেটিস বলা যায় না।


কারা বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারেন?


সম্ভাব্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে—


- শৈশব বা কৈশোরে দীর্ঘদিনের অপুষ্টির ইতিহাস

- খুব কম ওজন বা দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টি

- পর্যাপ্ত ক্যালরি ও পুষ্টি না পাওয়া

- নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের কিছু জনগোষ্ঠী

- অল্প বয়সে ডায়াবেটিস দেখা দেওয়া কিন্তু টাইপ-১ বা টাইপ-২-এর বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট না থাকা


তবে এসব বৈশিষ্ট্য থাকলেই টাইপ-৫ ডায়াবেটিস নিশ্চিত হয় না। সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।


টাইপ-৫ ডায়াবেটিসের সম্ভাব্য লক্ষণ


অন্যান্য ধরনের ডায়াবেটিসের মতো টাইপ-৫ ডায়াবেটিসেও রক্তে গ্লুকোজ বেড়ে গেলে কিছু সাধারণ লক্ষণ দেখা দিতে পারে, যেমন—


- অতিরিক্ত পিপাসা

- ঘন ঘন প্রস্রাব

- অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা ক্লান্তি

- ওজন কমে যাওয়া

- ক্ষুধার পরিবর্তন

- ক্ষত শুকাতে দেরি হওয়া

- দৃষ্টিতে ঝাপসা দেখা


কিন্তু এসব লক্ষণ শুধুমাত্র টাইপ-৫ ডায়াবেটিসের জন্য নির্দিষ্ট নয়।


টাইপ-১ ও টাইপ-২ থেকে পার্থক্য কী?


টাইপ-১ ডায়াবেটিসে সাধারণত শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষকে আক্রমণ করে।


টাইপ-২ ডায়াবেটিসে ইনসুলিনের প্রতি শরীরের প্রতিরোধ বা insulin resistance গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।


অন্যদিকে, টাইপ-৫ ডায়াবেটিসে দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টির সঙ্গে অপর্যাপ্ত ইনসুলিন উৎপাদনের সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এ কারণে টাইপ-১ বা টাইপ-২-এর সঙ্গে এর রোগজৈবিক বৈশিষ্ট্য এক নয়।


রোগ নির্ণয় কীভাবে করা হয়?


টাইপ-৫ ডায়াবেটিসের জন্য এখনো সর্বজনস্বীকৃত, নির্দিষ্ট একটি পরীক্ষাকে এককভাবে diagnostic test হিসেবে ব্যবহার করা হয় না। রোগীর—


- শারীরিক গঠন ও পুষ্টির অবস্থা

- পূর্বের অপুষ্টির ইতিহাস

- রক্তের গ্লুকোজ

- HbA1c

- প্রয়োজনে C-peptide ও অন্যান্য পরীক্ষা

- ডায়াবেটিসের অন্যান্য কারণ


এসব বিবেচনা করে চিকিৎসক রোগের ধরন নির্ণয় করতে পারেন।


IDF-এর Type 5 Diabetes Working Group বর্তমানে এই রোগের জন্য আরও নির্দিষ্ট diagnostic criteria এবং treatment guidelines তৈরির কাজ করছে।


চিকিৎসা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা


টাইপ-৫ ডায়াবেটিসের চিকিৎসা নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে। তাই নিজে থেকে ইনসুলিন, ট্যাবলেট বা কোনো ভেষজ ওষুধ শুরু বা বন্ধ করা উচিত নয়।


বিশেষ করে খুব কম ওজনের কোনো ব্যক্তির রক্তে শর্করা বেড়ে গেলে তাকে নিজের সিদ্ধান্তে টাইপ-১ বা টাইপ-২ রোগী ধরে চিকিৎসা করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শে পুষ্টির ঘাটতি, রক্তে গ্লুকোজ এবং ব্যক্তির সামগ্রিক স্বাস্থ্য বিবেচনা করে চিকিৎসা পরিকল্পনা করা জরুরি।


অপুষ্টি প্রতিরোধ কেন গুরুত্বপূর্ণ?


শিশু ও কিশোরদের সুস্থ বৃদ্ধি ও অগ্ন্যাশয়ের স্বাভাবিক বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত ও সুষম পুষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত—


- প্রোটিন

- শর্করা

- স্বাস্থ্যকর চর্বি

- ভিটামিন

- খনিজ

- পর্যাপ্ত ক্যালরি


নিশ্চিত করা দরকার।


তবে ডায়াবেটিস প্রতিরোধের নামে অতিরিক্ত খাবার সীমিত করা বা অস্বাস্থ্যকরভাবে ওজন কমানোও উচিত নয়।


শেষ কথা


টাইপ-৫ ডায়াবেটিস একটি গুরুত্বপূর্ণ ও নতুনভাবে আলোচিত স্বাস্থ্যবিষয়। এটি বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত এবং সাধারণ টাইপ-১ বা টাইপ-২ ডায়াবেটিস থেকে কিছুটা ভিন্ন বৈশিষ্ট্য বহন করতে পারে।


তবে এ বিষয়ে এখনো গবেষণা চলছে এবং রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার অনেক বিষয় আরও স্পষ্ট হওয়া দরকার। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচলিত তথ্য দেখে নিজে নিজে রোগের ধরন নির্ধারণ না করে রক্তে শর্করা অস্বাভাবিক হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।


সতর্ক থাকুন, সুষম খাবার খান এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন।


এই লেখাটি স্বাস্থ্যসচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি। এটি ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যে সব মেয়েরা মিলনের জন্য পাগল

প্রোস্টেটের বৃদ্ধি (BPH) কী?